Scroll Top
19th Ave New York, NY 95822, USA

হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে রোমান দেবীর মূর্তি প্রসঙ্গ

56208-ccswimkxhg-1492620590

বাংলাদেশের হাইকোর্টের সামনে রোমান ন্যায়বিচারের দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপন করার পর একাধিক গোষ্ঠী মূর্তিটি অপসারণের দাবি করেছে। আদালতে দীর্ঘ মামলাজট। স্বাধীনতার চার দশক পরেও বিচারকার্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা সম্ভব হয়নি। এত শত অবশ্যকরণীয় কর্তব্য থাকতেও পাগলকে কেন ‘নৌকা’ দোলানোর সুযোগ করে দেওয়া হলো? বাংলাদেশের মতো মুসলিমপ্রধান একটি দেশের প্রধান বিচারালয়ের সামনে বিমূর্ত কোনো ভাস্কর্যের পরিবর্তে একটি দেবীমূর্তি স্থাপন করাটাও কি একান্ত অপরিহার্য ছিল?

মূর্তি নির্মাণের কমপক্ষে চারটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে: ১. উপাসনা, ২. শিল্পসৃষ্টি, ৩. অলঙ্করণ এবং ৪. জাগতিক প্রয়োজন। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মে উপাসনার প্রয়োজনে মূর্তি তৈরি করা হয়। গ্রিক ও রোমানরা এবং জাহিলিয়া যুগের আরবেরা পূজার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি নির্মাণ করতো। রোঁদার ‘চিন্তামগ্ন’, মিলোর ‘ভেনাস’ বা আব্দুল্লাহ খালিদের ‘অপরাজেয় বাংলা’ ইত্যাদি ভাস্কর্য শিল্পসৃষ্টির উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে।

পাশ্চাত্যের শহরগুলোতে এখনও গ্রেকোরোমান দেবদেবীর মূর্তি স্থাপন করা হয়। এই মূর্তিস্থাপনের মুখ্য উদ্দেশ্য নগরের অলঙ্করণ এবং গৌণ উদ্দেশ্য নাগরিকদেরকে দেশ ও জাতির অতীত স্মরণ করিয়ে দেয়া। ঢাকার রাস্তার মোড়ে কুৎসিৎ হাতি, বেঢপ বাঘ কিংবা অতি নিম্নমানের সব ফরমায়েশি ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্দেশ্যও শহরের অলঙ্করণই হবে। থেমিস দেবীর মূর্তি নির্মাণের কারণ সম্ভবত হাইকোর্ট প্রাঙ্গনের অলঙ্করণ এবং নাগরিকদের এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া যে রোমান আইনই আধুনিক সব আইনের ভিত্তি।

মুসলমান কৃষকেরা ফসল রক্ষার জন্যে কাকতাড়ুয়া তৈরি করে। মুসলমান শিশুরা পুতুল নিয়ে খেলে, যেমন খেলতেন মহানবীর অনুমোদনক্রমে তাঁর স্ত্রী হজরত আয়েশা (রাঃ)। এই পুতুল বা কাকতাড়ুয়াগুলো এক একটি মূর্তি নয় কি? অন্তত পাসপোর্ট করার জন্যে হলেও মুসলমানেরা ছবি তুলতে বাধ্য হয়। চিত্রাঙ্কন নাজয়েজ হলে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র কীভাবে জায়েজ থাকে, কারণ এগুলো প্রতি সেকেন্ডে ২৪/২৫টি চলমান চিত্রের সমাহার? উপাসনার উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তির সঙ্গে শিল্পসৃষ্টি, অলঙ্করণ বা জাগতিক প্রয়োজনে নির্মিত মূর্তিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই জানেন, মানুষ কী উদ্দেশ্য মূর্তি নির্মাণ করছে।

উপাসনা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মূর্তি নির্মাণের ব্যাপারটা যে আরব অঞ্চলে অজানা ছিল না তার প্রমাণ, সুরা সাবার ১৩নং আয়াত, যাতে বলা হয়েছে, সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে জ্বিনেরা বাদশা সোলেমানের (সঃ) প্রার্থনাগৃহ অলঙ্করণের জন্যে মূর্তি নির্মাণ করেছিল। মাটি দিয়ে পাখির মূর্তি নির্মাণের উল্লেখ আছে সুরা আল ইমরানের ৪৯নং আয়াতে। সুরা মায়দার ৯০নং আয়াতে ‘মদ, জুয়া, আল আনসাআব এবং ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ’-কে শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। {আ} উপসর্গ, {ন-স-ব} ধাতু এবং {আ-আ} মধ্যপ্রত্যয় দিয়ে গঠিত ‘আনসাআব’ বিশেষ্যটির অর্থ ‘দেবতার পূজা বা পশুউৎসর্গের জন্যে ব্যবহৃত বেদী’, কোনোমতেই ‘অলঙ্করণ বা শিল্পসৃষ্টির উদ্দেশ্যে নির্মিত মূর্তি’ নয়।

ইসলামে যে কাজগুলো আসলেই নিষিদ্ধ, যেমন সুদ, চুরি, ব্যাভিচার ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে কোরানে একাধিক আয়াত আছে। কিন্তু অলঙ্করণ বা শিল্প সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মূর্তি নির্মাণ নিষিদ্ধ করে কোরানে একটিও আয়াত না থাকার কারণ কী? একটি হাদিসে অবশ্য বলা হয়েছে, হজরত আয়েশার কক্ষে প্রাণীর ছবিযুক্ত একটি পর্দা ঝুলছে দেখে হজরত মুহম্মদ (সঃ) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। কিন্তু উপরিউক্ত হাদিসে বলা হয়নি, ছবিগুলো কোন প্রাণীর ছিল। আমরা জানি, কুমির, বিড়াল, শিয়াল ইত্যাদি অনেক প্রাণীকেই মিশর ও আরব অঞ্চলে দেবতাজ্ঞানে পূজা করা হতো। হজরত আয়েশার কক্ষে যে ছবিগুলো মহানবীর ক্ষোভের কারণ হয়েছিল সেগুলো যদি জাহিলিয়া যুগের কোনো আরাধ্য প্রাণীর ছবি হয়ে থাকে, তবে তাঁর রাগ করার সঙ্গত কারণ ছিল বৈকি।

সেমিটিক জাতিগুলো একাধিক বার এক সৃষ্টিকর্তার নিরাকার উপাসনা ভুলে গিয়ে বহু দেবতার মূর্তি পূজায় অভ্যস্ত হয়েছিল। মুসা নবী (সঃ) নিরাকার সৃষ্টিকর্তার কথা নিশ্চিতভাবে বলার পরেও ঈহুদিরা গোবৎসের পূজা শুরু করেছিল। আইয়ামে জাহিলিয়া যুগের আরবেরা হযরত ইব্রাহিমের একেশ্বরবাদী ধর্ম ভুলে গিয়ে কাবা শরীফে এবং আরবের অন্যত্র বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি পূজা করতো। অপব্যবহার হবার ভয়ে সেমিটিক নবীমাত্রেই মূর্তি নির্মাণকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

সমস্যা হচ্ছে, মানুষের বোধের জগৎ মূর্তিময়। ভাষায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ আলাদা দুটি মূর্তি: মস্তিষ্কে ভাবমূর্তি ও উচ্চারণে শব্দমূর্তির সংমিশ্রণ। যখন বলা হয়, সৃষ্টিকর্তা কুর্সিতে বসে আছেন, পৃথিবীতে দেবদূত/ফেরেশতা পাঠাচ্ছেন, কোনো নবীর সঙ্গে কথা বলছেন, অথবা নবী নিজেই আসমানে যাচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে… তখন শ্রোতার মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টিকর্তার ‘ভাবমূর্তি’ সৃষ্টি হয়। ‘বসা’, ‘আসা’, ‘পাঠানো’, ‘দেখা করা’, ‘যাওয়া’ ইত্যাদি মনুষ্যসুলভ ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে ভাষা প্রকারান্তরে সৃষ্টিকর্তার উপর মনুষ্যত্ব আরোপ করে।

এ কাজে ভাষার ব্যাকরণও কিছু কম যায় না। আরবি ‘আল্লাহ’ বিশেষ্যটি পুংলিঙ্গ। হিন্দি-উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ভাষায়ও সৃষ্টিকর্তাদ্যোতক শব্দ পুংলিঙ্গ। এইসব ভাষাভাষী মানুষের ভাবনায় পুরুষ সৃষ্টিকর্তার ভাবমূর্তি, বাচনে কথামূর্তি এবং লিখনে লিপিমূর্তি সৃষ্টি হয়ে চলে। প্রতিমা তৈরি হয় ইট-কাঠ-মাটি-ধাতু দিয়ে, ভাবমূর্তি তৈরি হয় মস্তিষ্কে, কথামূর্তি তৈরি হয় শব্দ দিয়ে, লিপিমূর্তি তৈরি হয় বর্ণ দিয়ে। ঢাকা বিমানবন্দরের সামনে বাউল-ভাস্কর্যের পরিবর্তে স্থাপিত ইস্পাতে নির্মিত ভাস্কর্যটি প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকর্তার একটি ‘লিপিমূর্তি’।

অলঙ্করণের উদ্দেশ্যে মূর্তিনির্মাণ যে নিষিদ্ধ নয় তার প্রমাণ, মুসলমানপ্রধান অনেক দেশেই ভাস্কর্য আছে। মুসলিমপ্রধান ইন্দোনেশিয়ায় একাধিক শহরের রাস্তার মোড়ে হিন্দু দেবদেবীর মূতি আছে। কট্টর ওহাবিপন্থী সৌদি আরবের রাস্তাতেই রয়েছে বহু ভাস্কর্য, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ভাষ্কর্য উটের। এছাড়া আরব দেশগুলোতে বিমানবন্দরসহ সর্বত্র বাদশাহের বড় বড় ছবিও থাকে।

ভাস্কর্য সম্পর্কে আরব দেশের প্রকৃত মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে সৌদি আরবের বাদশা সালমান বিন আবদুল আজীজের এক আচরণে। বাদশা সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া সফরে গেলে সে দেশের সরকার তাঁর সম্মানে জাকার্তা শহরের মূর্তিগুলো ঢেকে দিয়েছিলেন। হিন্দুঅধ্যুষিত বালি দ্বীপের কর্তৃপক্ষকেও অনুরূপ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা এই নির্দেশ অমান্য করেছে। সৌদি বাদশা এতে আপত্তি করাতো দূরের কথা, বরং বালি দ্বীপে তাঁর সফর তিন দিন বাড়িয়ে দিয়েছেন। মন্দিরের কাঁসর-ঘণ্টার শব্দে বাদশা বা তাঁর সহস্রাধিক সফরসঙ্গীর ধর্ম পালনে কোনো প্রকার অসুবিধা হয়েছে বলে জানা যায়নি। বাংলাদেশের যেসব আকলমন্দ পোপের চেয়ে বেশি ক্যাথলিক হতে চায়, মূর্তিনির্মাণ এবং অমুসলমান প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের তরিকা সম্পর্কে সৌদী বাদশার এই উদারনৈতিক ইশারা কি তাদের মনোভাব পরিবর্তনে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখবে?

হাইকোর্টের মূর্তি নিয়ে উত্তেজনা যখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে তখন বাংলাদেশের শাসন বিভাগের প্রধান বলেছেন, মূর্তিটি তাঁর নিজেরও পছন্দ নয় এবং মূর্তিটি তিনি সরানোর ব্যবস্থা করবেন। পত্রিকায় খবরটি দেখে ত্রিশের দশকের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো। সূর্যসেন তখন চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি। তাঁকে জেল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে বিপ্লবীরা। জনগণের মধ্যেও চাপা উত্তেজনা। এ ধরণের পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা যেমন, জেলাকমিশনার বা দারোগারা খুবই চাপে থাকেন। অনুরূপ চাপের মুখে চট্টগ্রামের ইংরেজ জেলা কমিশনার ব্রিটিশ ভারতের বিচার বিভাগকে লিখলেন, তাড়াতাড়ি মাস্টারদার বিচারটা সেরে ফেলে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে দিতে। সপ্তাহখানেক পরে সেই জেলাকমিশনারকে কয়েক ধাপ পদাবনতি দিয়ে বদলি করা হয়েছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা বাখরগঞ্জে। সেখানে একে একে তার দুই মেয়ে আর বৌ মারা গেল মশার কামড়ে, নিজেরও এত স্বাস্থ্যহানি হলো যে প্রায় মরমর অবস্থা। অবশেষে দেশভাগের বছর খানেক আগে প্রাক্তন সেই জেলাকমিশনার কর্তৃপক্ষকে দ্বিতীয় চিঠিটি লেখার সাহস করলেন: ‘মহানুভব কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন, আমার ভুলের জন্যে আমি যথেষ্ট শাস্তি পাইয়াছি, তবে দয়াপরবশ হইয়া কোনো সভ্য স্থানে, অন্ততপক্ষে ঢাকায় আমাকে বদলি করিলে, অধম চিরকৃতজ্ঞ থাকিবে।’ আবেদন গ্রাহ্য করে সেই কর্মকর্তাকে ঢাকার পাবলিক সার্ভিস কমিশনে বদলি করা হয়েছিল।

Related Posts

Comments (12)

লেখাটা অনেক গুছানো। ইতিহাসের পাঠগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, যতক্ষণ পড়ছিলাম! তবে শেষের অনুচ্ছেদে রূপকের অর্থ বুঝতে পারিনাই, স্যার।

Good article to read

Cialis Tablets 20mg buy kamagra with american express levitra tarif belgique

Levitra Para Hipertensos CibiapCavy can i buy levitra in mexico Exams and Tests The doctor will perform a physical exam. Monitereorne

The biological actions of estrogens are mainly mediated by the estrogen receptor ER О± and ERОІ, which belong to the nuclear receptor superfamily 1 order proscar for hair loss

Leave a comment